
ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে কিংবা বছরের বিভিন্ন সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ছুটিতে দেশে ফেরেন অনেক প্রবাসী। ফেরার সময় সাধারণ ও নিম্ন আয়ের কিছু প্রবাসীকে অর্থের বিনিময়ে অবৈধ লাগেজ বহনে ব্যবহার করছে একটি অসাধু চক্র। দেশে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে কখনও টিকিটের মূল্য পরিশোধ, আবার কখনও ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে চক্রটি প্রবাসীদের কাজে লাগাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রবাসীদের লাগেজে করে পাঠানো হয় স্বর্ণ, মোবাইল ফোনসেট, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন মালপত্র। এ ছাড়া খাবারের প্যাকেটের নাম দিয়ে ওষুধ, মাদকসহ কাস্টমস নিষিদ্ধ বহু পণ্যও তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রবাসীদের লাগেজে।
বিমানের টিকিট বা আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে এসব চক্রের মালপত্র বিমানবন্দর পার করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন প্রবাসীরা। আটকের পর অনেকে জেল-জরিমানাসহ বড় শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন। দিন দিন বাড়ছে এ ধরনের ভুক্তভোগীর সংখ্যা।
সিলেটের সাঈদ আহমদ ছুটি শেষ করে কথা ছিল আগামী ২৯ এপ্রিল কর্মস্থল সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফিরবেন। কিন্তু তিনি এখন সিলেটের কারাগারে বন্দি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি শারজাহফেরত সাঈদ আহমদ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণসহ আটক হন। পরিবার জানায়, আমিরাতের ফুজাইরাহ অঞ্চলের একটি আইসক্রিমের দোকানে কাজ করতেন তিনি। চার বছর পর ছুটিতে দেশে ফিরছিলেন। তাঁর লাগেজে ছিল অন্য এক প্রবাসীর দেওয়া চার্জার লাইট, ফ্যান ও থাই গ্লাসের লক, যা দেশে নিয়ে আসার বিনিময়ে মাত্র ৪০০ দিরহাম পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সিলেট পৌঁছলে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও শুল্ক গোয়েন্দারা তল্লাশি করে এসব পণ্যের ভেতরে পায় স্বর্ণ। আটক হন একই ফ্লাইটের আরও দুই যাত্রী।
সাঈদ আহমদের ছোট ভাই সাইম আহমদ জানান, বিমানবন্দরে আটকের পর তিনি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে সাঈদ দাবি করেছেন, আরব আমিরাতেই তাঁর বাসায় কেউ একজন বিভিন্ন মালপত্র প্যাকেট করে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি কোনো কিছু যাচাই না করে সেসব নিয়ে এসেছিলেন। সাঈদ নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন।
একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বদিউল আলম ছুটি শেষ করে দুবাই ফিরছিলেন। অন্যের দেওয়া একটি খাবারের বাক্স বহন করেন তিনি। দুবাই বিমানবন্দরের পুলিশের তল্লাশিতে তাঁর খাবারের বাক্সে ১৩০ গ্রাম গাঁজা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটির আদালত বদিউল আলমকে যাবজ্জীবন সাজা দেন। পরিবারের দাবি, প্রতিবেশী রমজান নামে আরেক প্রবাসীর স্ত্রীর দেওয়া খাবারের বাক্স বহন করছিলেন বদিউল।
বদিউল আলমের ভাই আজিজুল সঞ্জয় বলেন, সরল বিশ্বাসে উপকার করতে গিয়ে আমাদের পুরো পরিবার আজ বিপর্যস্ত। আইনি জটিলতায় বিনা দোষে সাজা খাটছে আমার ভাই। সে জীবনে কখনও গাঁজা দেখেওনি। অল্প বয়সেই বিদেশ চলে গিয়েছিল। দুই বছর পরপর দুই-আড়াই মাসের ছুটিতে আসত।
সঞ্জয় বলেন, রমজান নামের ওই প্রবাসীর স্ত্রী পারভীন আক্তার আমার ভাইয়ের কাছে খাবারের বাক্স দিয়েছিল। আমরা ঘটনার পরদিনই স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছিলাম। পুলিশ ওই নারীকে ধরতে গিয়েছিল; কিন্তু সে পালিয়ে যায়। এর পর খবর পেয়ে ওই দিনই তার স্বামী রমজান আজমান থেকে দেশে চলে আসে। আমাদের দূতাবাস যেন উদ্যোগী হয়ে এসব ভুক্তভোগীর জন্য কিছু একটা করে।
প্রবাসীরা বলছেন, স্বর্ণের দামের ওপর নির্ভর করে এই চক্রের কার্যক্রম। আবার উৎসব ঘিরেও বাড়ে তাদের দৌরাত্ম্য। বিমান টিকিটের চড়া মূল্য পরিশোধের সামর্থ্য না থাকায় কিছু প্রবাসী তাদের প্রলোভনে পা দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ লোভে পড়েও পা বাড়ান এই পথে। সামান্য অর্থের লোভ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে অপরিচিত কিংবা আত্মীয়-প্রতিবেশীর দেওয়া মালপত্র বহন করতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন তারা। বিশেষ করে আমিরাত থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটমুখী ফ্লাইটের যাত্রীরা এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন বেশি। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রবাসীদের সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে আরব আমিরাতে বাংলাদেশ মিশন ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।
দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, আরব আমিরাতের আইন অত্যন্ত কঠোর। বিশেষ করে নিষিদ্ধ পণ্য বহনের ক্ষেত্রে বড় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। বিমানবন্দরে কেউ গ্রেপ্তার হলে দ্রুতই তাদের সাজা হয়ে যায়। আমরা জেনেছি, এমন কিছু প্রবাসী বিমানবন্দরে আটক হচ্ছেন। তারা এমন কিছু দ্রব্য বহন করেন; যা সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বা নিষিদ্ধ। প্রবাসীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে অপরিচিত লোকজনের দেওয়া পণ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া বহন না করার আহ্বান জানান তিনি।
বিমান দুবাইয়ের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক সাকিয়া সুলতানা বলেন, আমরা জেনেছি, অন্যের মালপত্র বহন করে শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন অনেক প্রবাসী। ঝামেলা এড়াতে অপরিচিত লোকের লাগেজ বহনের ক্ষেত্রে ভেতরের মালপত্র ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। কাস্টমস নীতি অনুসরণ করে পণ্য বহনের অনুরোধ জানান তিনি।
সূত্র: সমকাল
প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও জনপ্রিয় সাইট থেকে হুবহু কপি করা। তাই দায়ভার মুল পাবলিশারের। এরপরও কোন অভিযোগ বা ভিন্নমত থাকলে আমাদেরকে জানান আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব সমাধান করে নিতে। |