প্রচ্ছদ জাতীয় কোটা সংস্কার আন্দোলনে চট্টগ্রামে নিহত ৩, সর্বশেষ যা জানা গেল

কোটা সংস্কার আন্দোলনে চট্টগ্রামে নিহত ৩, সর্বশেষ যা জানা গেল

চট্টগ্রামে নগরে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে পাঁচটার মধ্যে নগরের ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর, শুলকবহর এবং চট্টগ্রাম কলেজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত তিনজনের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন মো. ফারুক (৩২) ও মো. ওয়াসিম আকরাম (২২)।

ফারুক শুলকবহর এলাকায় একটি ফার্ণিচার দোকানের কর্মচারী এবং ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার পেকুয়া থানার মেহেরনামা গ্রামে। তার বাবার নাম সবুর আলম।

নিহত ফারুকের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার চান্দিনা থানার হাশিমপুর গ্রামে। তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন চট্টগ্রাম নগরের লালখানবাজার টাংকির পাহাড় এলাকায়। তার বাবার নাম মো. দুলাল।

এছাড়া নিহত অপরজনের পরিচয় জানা যায়নি। তার বয়স ২৪। নিহতদের মধ্যে ছুরিকাঘাতে ওয়াসিম আকরাম, গুলিতে ফার্ণিচার দোকানের কর্মচারী ফারুক ও অজ্ঞাত যুবক নিহত হয়েছেন। এই তিনজনকে বিকাল সাড়ে চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে মৃত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নুজহাত।

চমেক হাসপাতালের জরুরী বিভাগে বিকাল সাড়ে চারটা থেকে সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা পর্যন্ত এই প্রতিবেদক অবস্থান করেন। এ সময়ে গুরুতর আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় ভ্যানগাড়ি, রিকশা, অটোরিকশা ও অ্যাম্বুলেন্সে করে চমেক হাসপাতালে আনতে দেখা গেছে।

সংঘর্ষের কারণে নগরের ব্যস্ততম সিডিএ অ্যাভিনিউ সড়কে অন্তত ৩ ঘণ্টা গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময়ে আতঙ্কিত হয়ে সাধারণ মানুষ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। আশপাশের অন্যান্য সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এদিকে সংঘর্ষের পর চট্টগ্রামে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবির ব্যাটালিয়ন-৮ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহেদ মিনহাজ সিদ্দিকী।

এর আগে বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর, প্রবত্তর্ক মোড়, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকায় কোটাবিরোধী শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় ওই এলাকাগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সব জায়গায় পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও তারা ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়। সংঘর্ষে ছাত্রলীগ—যুবলীগের নেতাকমীর্রা আগ্নেয়াস্ত্র, লাঠিসোঁটা ব্যবহার করতে দেখা গেছে। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে ষোলশহর দুই নম্বর গেইট এলাকায় এবং বিকাল চারটার দিকে প্রবত্তর্ক এলাকায় পুলিশের সামনেই অন্তত ৮/১০টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকমীর্রা। এ সময় এই প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়ার সময় সাধারণ পথচারীদের ওপরও ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকমীর্দের মারধর করতে দেখা গেছে।

কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা কয়েকদিন ধরে প্রথমে ষোলশহর রেলস্টেশনে জড়ো হয়ে এরপর রেলপথ ও সড়ক অবরোধ করে আসছিলেন। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকেও তারা একই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই ষোলশহর রেলস্টেশনে লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। দুপুরের মধ্যেই সেখানে কয়েক’শ নেতাকর্মীর সমাগম ঘটে। দুই নম্বর গেইট ও মুরাদপুরে আলাদাভাবে দুপুরের আগেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হন।

বিকেল সাড়ে ৩টার আগে কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরাও ভাগ হয়ে নগরের ষোলশহর রেলস্টেশন, দুই নম্বর গেইট এবং মুরাদপুরে অবস্থান নেয়। দুই নম্বর গেইটে কোটাবিরোধীরা সংঘবদ্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করতে চাইলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় ওয়াসা মোড় থেকে জিইসি হয়ে আসা একটি মিছিল থেকে কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। উভয়পক্ষ পরস্পরের দিকে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকেন।

একইভাবে ষোলশহর রেলস্টেশনের সামনের সড়কে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিকাল সোয়া তিনটার দিকে মুরাদপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়লে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এ সময় কয়েকজন অস্ত্রধারীকে গুলিবর্ষণ করতে দেখা যায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অন্তত ১২টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। পরে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন।

সংঘর্ষে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকমীর্রা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। তবে পুলিশ কেন নীরব ছিল সে বিষয়ে কোনো জবাব দেননি তিনি।